আপনার বাচ্চা কি রোজ ডিম খেতে চাইছে না? শিশুর মেধা ও হাড়ের বিকাশে ডিম কেন এত জরুরি এবং সহজে খাওয়ানোর দারুণ কিছু উপায়
নমস্কার! আমি প্রসেনজিৎ দাস, আপনাদের সবার পরিচিত 'স্মার্ট শিশু' ওয়েবসাইটের প্রতিষ্ঠাতা। প্রতিদিনের মতো আজও আমি আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি এমন একটি বিষয় নিয়ে, যা প্রতিটি ঘরের, প্রতিটি মায়ের প্রতিদিনের চিন্তার কারণ। সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে বাচ্চার স্কুলের টিফিন গোছানো, আর তারপর তাকে খাইয়ে স্কুলে পাঠানো—এই পুরো সময়টা একটা বড় যুদ্ধের মতো মনে হয়, তাই না? আর এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় খলনায়ক হলো বাচ্চার 'খাবারে অনীহা'। বিশেষ করে রোজ সকালে একই খাবার দেখলে বাচ্চারা মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
আমাদের 'স্মার্ট শিশু' পরিবারের অনেক বাবা-মায়েরাই আমাকে মেসেজ করে বা কমেন্টে প্রায়ই একটা কথা জিজ্ঞেস করেন— "প্রসেনজিৎ দা, আমার বাচ্চা তো ঠিকমতো পুষ্টিকর খাবার খেতেই চায় না। ওকে এমন কী দেব যা ওর শরীরের সমস্ত পুষ্টির ঘাটতি মেটাবে, আবার ও ভালোবেসে খাবেও?" এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আজ আমি শুধু একটি মাত্র 'সুপারফুড' বা স্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর পুরো ফোকাস রাখব। আর সেই অতি পরিচিত, সস্তা অথচ পুষ্টিতে ভরপুর খাবারটি হলো— ডিম।
আজকের এই বিস্তারিত আলোচনায় আমরা জানব, কেন আপনার সন্তানের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় একটি ডিম থাকা ভীষণ জরুরি, ডিমের কোন অংশে কী পুষ্টি থাকে, গরমকালে ডিম খাওয়ানো নিয়ে আমাদের মনের ভুল ধারণাগুলো কী কী, এবং সবচেয়ে বড় কথা—যে বাচ্চা ডিম দেখলেই ছুটে পালায়, তাকে কীভাবে খুব চালাকি করে মজার মজার উপায়ে ডিম খাওয়ানো যায়। একটু সময় নিয়ে আজকের এই দরকারি আলোচনাটি শুরু করা যাক।
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ডিম কেন এত জরুরি?
আমরা সবাই জানি ডিম খাওয়া ভালো। কিন্তু কেন ভালো, সেটা হয়তো আমরা অনেকেই সেভাবে গুছিয়ে জানি না। একটা ছোট্ট ডিমের ভেতর প্রকৃতি যে কত রকমের পুষ্টি লুকিয়ে রেখেছে, তা জানলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। আসুন, খুব সহজ করে জেনে নিই ডিম আপনার সোনামণির শরীরে গিয়ে ঠিক কী কী কাজ করে:
১. শরীর গঠনের ফার্স্ট ক্লাস প্রোটিন
একটি বাড়ি তৈরি করতে যেমন ভালো মানের ইট আর সিমেন্ট লাগে, ঠিক তেমনি আপনার শিশুর শরীরটাকে মজবুত করতে দরকার প্রোটিন। ডিমকে বলা হয় ফার্স্ট ক্লাস প্রোটিন বা প্রথম শ্রেণির প্রোটিন। কারণ আমাদের শরীর নিজের থেকে যেসব অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি করতে পারে না, তার প্রায় সব কটিই এই ডিমের মধ্যে একদম সঠিক মাত্রায় মজুত থাকে। একটি সাধারণ সাইজের ডিমে প্রায় ৬ গ্রাম খাঁটি প্রোটিন থাকে, যা আপনার বাচ্চার পেশি বা মাসেল মজবুত করতে এবং তাকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করে তুলতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।
২. মেধা ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে coline
আজকাল বাচ্চাদের পড়াশোনার প্রচুর চাপ। স্কুলে এত পড়া মনে রাখতে গিয়ে তারা অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আপনি কি জানেন, ডিমের কুসুমের মধ্যে 'কোলিন' (Choline) নামে একটি অত্যন্ত দরকারি উপাদান থাকে? এই কোলিন সরাসরি বাচ্চাদের মস্তিষ্কের গঠন এবং স্মৃতিশক্তি বা মেমরি পাওয়ার বাড়াতে সাহায্য করে। যেসব বাচ্চারা নিয়মিত ডিম খায়, তাদের স্কুলে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা এবং নতুন কিছু দ্রুত শেখার ক্ষমতা অন্য বাচ্চাদের তুলনায় অনেক বেশি প্রখর হয়।
৩. চোখের সুরক্ষায় লুটেইন
বর্তমান সময়ে বাচ্চারা প্রচুর সময় কাটায় মোবাইল, টিভি বা কম্পিউটারের স্ক্রিনের সামনে। এর ফলে খুব অল্প বয়সেই তাদের চোখে চশমা উঠে যাচ্ছে। ডিমের কুসুমের মধ্যে লুটেইন (Lutein) এবং জিয়াজ্যান্থিন (Zeaxanthin) নামক দুটি উপাদান থাকে। এই উপাদানগুলো বাচ্চাদের চোখের রেটিনাকে ভালো রাখে এবং মোবাইল থেকে বেরোনো ক্ষতিকর নীল আলোর হাত থেকে চোখকে রক্ষা করে। তাই চোখের জ্যোতি ধরে রাখতে ডিমের খুব ভালো বিকল্প।
৪. হাড় ও দাঁত শক্ত করতে ভিটামিন ডি
খুব কম খাবারেই প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়, যার মধ্যে ডিম অন্যতম। বাচ্চাদের হাড় লম্বা হতে এবং দাঁত মজবুত হতে ক্যালসিয়াম খুব দরকার। কিন্তু শরীরে যদি ভিটামিন ডি না থাকে, তবে দুধ বা অন্যান্য খাবার থেকে ক্যালসিয়াম শরীরে ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। ডিমের ভেতরে থাকা ভিটামিন ডি সেই ক্যালসিয়ামকে শরীরে ধরে রাখতে সাহায্য করে। ফলে আপনার বাচ্চা দ্রুত লম্বা হয় এবং তাদের হাড় শক্ত হয়।
বয়স অনুযায়ী আপনার বাচ্চাকে দিনে কয়টি ডিম দেওয়া উচিত?
ডিম অত্যন্ত পুষ্টিকর হলেও, সব বয়সের বাচ্চার জন্য ডিমের পরিমাণ এক নয়। বাচ্চার বয়স এবং তার হজমশক্তির ওপর নির্ভর করে ডিমের পরিমাণ ঠিক করতে হয়। নিচে বয়সভিত্তিক একটি সহজ হিসাব দেওয়া হলো:
- ৬ মাস থেকে ১ বছর বয়স পর্যন্ত: এই সময়ে বাচ্চারা সবেমাত্র বুকের দুধের পাশাপাশি বাইরের শক্ত খাবার খেতে শেখে। ৬ মাস বয়সের পর থেকে বাচ্চাকে ডিম খাওয়ানো শুরু করা যেতে পারে তবে। তবে শুরুতে পুরো ডিম দেবেন না। প্রথমে শুধু ডিমের কুসুমের চার ভাগের এক ভাগ দিয়ে শুরু করুন বা আরো অল্প। যদি দেখেন বাচ্চার হজমে কোনো সমস্যা হচ্ছে না বা অ্যালার্জি বেরোচ্ছে না, তবে ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়ান। ৮-৯ মাস বয়স থেকে তাকে ডিমের সাদা অংশ দেওয়া শুরু করতে পারেন।
- ১ থেকে ৩ বছর বয়স পর্যন্ত (টডলার): এই বয়সের বাচ্চারা সারাদিন ভীষণ দৌড়ঝাঁপ করে। তাদের এনার্জি অনেক বেশি লাগে। এই বয়সের একজন সুস্থ বাচ্চাকে আপনি প্রতিদিন ১টি করে সেদ্ধ ডিম অনায়াসেই দিতে পারেন।
- ৪ থেকে ৮ বছর বয়স পর্যন্ত: প্রি-স্কুল বা প্রাইমারি স্কুলে যাওয়ার বয়সে বাচ্চাদের শারীরিক বৃদ্ধি খুব দ্রুত হয়। এই বয়সের বাচ্চাদের প্রতিদিন ১টি বা কখনো কখনো চাইলে ২টি ডিমও দেওয়া যেতে পারে, যদি সে খেলাধুলা বা শারীরিক পরিশ্রমে বেশি যুক্ত থাকে।
- ৯ থেকে ১৩ বছর বা তার বেশি: এই সময়ে বাচ্চারা কৈশোরে পা দেয়। তাদের ক্ষুধা ও পুষ্টির চাহিদা অনেকটা বড়দের মতোই হয়ে যায়। এই বয়সের ছেলেমেয়েদের প্রতিদিন অনায়াসে ২টি ডিম দেওয়া যায়।
ডিমের কুসুম নাকি সাদা অংশ—বাচ্চার জন্য কোনটি বেশি উপকারী?
আমাদের স্মার্ট শিশু প্ল্যাটফর্মে অনেক মা আমাকে এই প্রশ্নটা করেন— "দাদা, ডিমের কুসুমে তো অনেক ফ্যাট থাকে, আমি কি আমার বাচ্চাকে শুধু ডিমের সাদা অংশটুকু সেদ্ধ করে দেব?"
আমি অভিভাবক হিসেবে আপনাদের একটি কথা খুব সহজে বলতে চাই—বাচ্চাদের কোনোভাবেই বড়দের খাবার বা অভ্যাস এর সাথে মেলাবেন না। বড়দের ক্ষেত্রে হয়তো ডাক্তাররা কোলেস্টেরল কমানোর জন্য ডিমের কুসুম বাদ দিতে বলেন, কিন্তু একজন বাড়ন্ত শিশুর জন্য ডিমের কুসুম হলো পুষ্টির আসল খনি। ডিমের সাদা অংশে মূলত প্রোটিন থাকে ঠিকই, কিন্তু মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য দরকারি কোলিন, চোখের জন্য লুটেইন, এবং শরীরের জন্য ভীষণ জরুরি গুড ফ্যাট বা স্বাস্থ্যকর চর্বি পুরোটাই থাকে ওই হলুদ কুসুমটার ভেতরে।
বাচ্চাদের ব্রেন বা মস্তিষ্কের প্রায় ৬০ শতাংশই তৈরি হয় ফ্যাট দিয়ে। তাই ওই কুসুমের ফ্যাট আপনার বাচ্চার ওজন অকারণে বাড়াবে না, বরং তার নার্ভের গঠন ও হরমোন তৈরিতে সাহায্য করবে। তাই বাচ্চাকে ডিম দিলে সব সময় পুরো ডিমটাই দেবেন, কুসুম বাদ দিয়ে তাদের পুষ্টি থেকে বঞ্চিত করবেন না।
গরমকালে কি বাচ্চাকে রোজ ডিম খাওয়ানো ঠিক? (একটি খুব সাধারণ ভুল ধারণা)
আমাদের বাঙালিদের মধ্যে একটি খুব পুরোনো ধারণা আছে যে, গরমকাল এলেই বাচ্চার পাতে ডিম দেওয়া কমিয়ে দিতে হবে। অনেকেই ভাবেন, "ডিম খেলে শরীর খুব গরম হয়ে যায়, বাচ্চার গায়ে ঘামাচি বা পেটের গোলমাল হতে পারে।" চলুন আজ এই ধারণাটার আসল সত্যতা জেনে নিই।
ডাক্তার এবং পুষ্টিবিদরা সহজেই জানাচ্ছেন যে, ডিমের কারণে শরীরের ভেতর থেকে এমন কোনো তাপ তৈরি হয় না যা বাচ্চার ক্ষতি করতে পারে। গরমকালে বাচ্চার শরীর খারাপ হয় মূলত জলের অভাবে (Dehydration) অথবা বাইরের অতিরিক্ত তেল-মসলা দেওয়া খাবার খাওয়ার কারণে। আপনি যদি গরমকালে বাচ্চাকে প্রচুর পরিমাণে জল খাওয়ান এবং সুতির হালকা পোশাক পরিয়ে রাখেন, তবে রোজ একটি করে ডিম খেলে তার কোনোই ক্ষতি হবে না।
তবে হ্যাঁ, রান্নার ধরনে একটু বদল আনতে হবে। গরমের দিনে ডিমের কষা বা অতিরিক্ত তেল দিয়ে ভাজা অমলেট না দিয়ে, হালকা করে সেদ্ধ করা ডিম, ডিমের হালকা ঝোল বা সবজি দিয়ে ডিমের স্টু (Egg Stew) বানিয়ে দিন। এতে হজম খুব সহজে হবে এবং বাচ্চা পুষ্টিটাও পুরো পাবে।
বাচ্চা রোজ সেদ্ধ ডিম খেতে না চাইলে কী করবেন? (খাওয়ানোর কিছু বুদ্ধিদীপ্ত উপায়)
সবচেয়ে বড় সমস্যাটা শুরু হয় খাবার টেবিলে। বাচ্চারা খুব তাড়াতাড়ি একঘেয়েমিতে ভোগে। রোজ সকালে একই রকম দেখতে একটা সাদা গোল সেদ্ধ ডিম প্লেটে দেখলে তাদের আর খেতে ইচ্ছা করে না। তখন মায়েরা রেগে গিয়ে বকাঝকা শুরু করেন, আর পুরো সকালের পরিবেশটাই খারাপ হয়ে যায়। জোর করে খাওয়ালে বাচ্চার খাবারের প্রতি একটা ভয় তৈরি হয়ে যায়। এর বদলে একটু বুদ্ধি করে ডিমের রূপ ও স্বাদ বদলে দিন। নিচে এমন কিছু দারুণ আইডিয়া দিলাম, যা আপনাদের খুব কাজে আসবে:
১. সবজি দিয়ে লুকানো ডিমের অমলেট (Hidden Veggie Omelette)
যে বাচ্চা সবজি এবং ডিম দুটোই খেতে চায় না, তার জন্য এটি সেরা উপায়। গাজর, ক্যাপসিকাম, পেঁয়াজ এবং বিনস একদম মিহি করে কুচিয়ে নিন। এবার ডিমের সাথে এই সবজিগুলো, সামান্য নুন এবং এক চিমটে গোলমরিচ দিয়ে ভালো করে ফেটিয়ে নিন। সামান্য মাখন বা ঘি দিয়ে প্যানে সুন্দর করে অমলেট বানিয়ে দিন। সবজিগুলো এত মিহি থাকবে যে বাচ্চা বুঝতেই পারবে না সে কী খাচ্ছে, আর স্বাদও হবে দারুণ।
২. ফ্রেঞ্চ টোস্টের নতুন রূপ (Healthy French Toast)
বাচ্চারা সাধারণত পাউরুটি খেতে ভালোবাসে। একটি বাটিতে ডিম ফেটিয়ে তাতে সামান্য দুধ এবং খুব সামান্য মধু বা লাল চিনি মিশিয়ে নিন। এবার একটি ব্রাউন ব্রেড বা আটার পাউরুটি সেই মিশ্রণে ডুবিয়ে হালকা আঁচে মাখন দিয়ে সেঁকে নিন। এটি খেতে খুব নরম ও সুস্বাদু হয়। টিফিনের জন্য এটি একটি দারুণ এবং পেট-ভরা খাবার।
৩. মজার আকারের ডিম (Fun Shapes)
বাচ্চারা খাওয়ার আগে চোখ দিয়ে খায়। খাবার দেখতে যত মজার হবে, তারা তত আনন্দ করে খাবে। বাজার থেকে তারা (Star), ফুল বা হার্ট শেপের কিছু কুকি কাটার কিনে আনুন। ডিমের সাধারণ অমলেট বানিয়ে বা সেদ্ধ ডিমকে কেটে এই ছাঁচগুলো দিয়ে সুন্দর আকার তৈরি করে দিন। যখন সে প্লেটে একটা তারা বা ফুলের আকারের ডিম দেখবে, সে নিজেই আগ্রহ করে সেটা খেয়ে নেবে।
৪. আলু ও ডিমের চটকানো মাশ (Egg and Potato Mash)
একটি আলু এবং একটি ডিম একসাথে সেদ্ধ করে নিন। এবার দুটোকে একসাথে খুব ভালো করে চটকে বা মাশ করে নিন। এর মধ্যে খুব সামান্য মাখন বা ঘি এবং একটু গোলমরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিন। এটি খেতে এত নরম এবং ক্রিমি হয় যে ছোট বাচ্চারা, বিশেষ করে যাদের দাঁত পুরো ওঠেনি, তারা খুব সহজেই গিলে নিতে পারে।
কাঁচা বা আধা-সেদ্ধ ডিম কি বাচ্চাদের দেওয়া নিরাপদ?
অনেক অভিভাবক মনে করেন, ডিম আধা-সেদ্ধ (Half-boiled) করে বা পোচ করে খাওয়ালে হয়তো বেশি পুষ্টি পাওয়া যায়। কিন্তু ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এটি একটি মারাত্মক ভুল হতে পারে। ডিমের খোলার গায়ে এবং অনেক সময় ভেতরে 'সালমোনেলা' (Salmonella) নামক এক ধরণের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকে। এই ব্যাকটেরিয়া পেটে গেলে বাচ্চার প্রচণ্ড পেট খারাপ, বমি এবং জ্বর হতে পারে।
বড়দের হজমশক্তি অনেক বেশি শক্তিশালী হওয়ায় তারা আধা-সেদ্ধ ডিম অনায়াসে হজম করতে পারে, কিন্তু ৫ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি তৈরি হয় না। তাই বাচ্চাদের যখনই ডিম দেবেন, সেটা খুব ভালোভাবে সেদ্ধ করে বা ভেজে দেবেন। ডিম সেদ্ধ করার সময় ফুটন্ত জলে অন্তত ১০ থেকে ১২ মিনিট রাখবেন, যাতে ভেতরের কুসুমটা একদম শক্ত হয়ে যায়। কাঁচা বা তরল কুসুম বাচ্চাদের দেবেন না।
প্রথমবার বাচ্চাকে ডিম দেওয়ার সময় অ্যালার্জির বিষয়ে সতর্কতা
ডিম একটি অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর খাবার হলেও, কিছু কিছু বাচ্চার শরীরে ডিম থেকে অ্যালার্জি (Egg Allergy) হতে পারে। বিশেষ করে যখন আপনি ৬ বা ৭ মাস বয়সে প্রথমবার বাচ্চাকে ডিম খাওয়াচ্ছেন, তখন খুব সাবধানে থাকতে হবে।
কীভাবে বুঝবেন অ্যালার্জি হচ্ছে কি না?
প্রথম দিন বাচ্চাকে সামান্য একটু ডিমের কুসুম দেওয়ার পর অন্তত ৩ দিন অপেক্ষা করুন। এই তিন দিনের মধ্যে তাকে নতুন আর কোনো খাবার দেবেন না। একে বলা হয় 'থ্রি-ডে ওয়েট রুল' (3-Day Wait Rule)। যদি দেখেন ডিম খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাচ্চার গায়ে লাল লাল র্যাশ বেরোচ্ছে, বারবার বমি করছে, ঠোঁট বা মুখ ফুলে যাচ্ছে, অথবা প্রচণ্ড পেট ব্যথা ও ডায়রিয়া শুরু হয়েছে—তবে বুঝতে হবে তার ডিম থেকে অ্যালার্জি হচ্ছে। এমনটা দেখলে সাথে সাথে ডিম দেওয়া বন্ধ করুন এবং একজন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। তবে আশার কথা হলো, বেশিরভাগ বাচ্চারই বয়স ৫-৬ বছর হওয়ার পর এই অ্যালার্জির সমস্যা নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়।
ব্রয়লার মুরগির ডিম নাকি দেশি মুরগির ডিম—কোনটি কেনা উচিত?
বাজারে গেলে আমরা সাধারণত সাদা রঙের ব্রয়লার মুরগির ডিম এবং লাল বা বাদামি রঙের দেশি মুরগির ডিম দেখতে পাই। অনেক বাবা-মায়েরাই দাম বেশি দিয়ে দেশি মুরগির ডিম কেনেন এই ভেবে যে, এতে পুষ্টি অনেক বেশি।
বিজ্ঞান কিন্তু বলছে অন্য কথা। একটি সাদা ডিম এবং একটি লাল ডিমের মধ্যে পুষ্টিগুণের খুব একটা পার্থক্য থাকে না। দুটোতেই প্রায় একই পরিমাণ প্রোটিন এবং ভিটামিন থাকে। মুরগির জাতের ওপর নির্ভর করে ডিমের খোলার রং বদলায়, পুষ্টির ওপর এর কোনো প্রভাব নেই। তবে হ্যাঁ, দেশি মুরগি যেহেতু মাঠেঘাটে ঘুরে প্রাকৃতিক খাবার খায়, তাই অনেকের মতে এই ডিমে রাসায়নিক বা অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাব কম থাকে। আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী আপনি যেকোনো ডিমই খাওয়াতে পারেন, আসল বিষয় হলো ডিমটি যেন একদম 'টাটকা' বা সতেজ হয়।
কীভাবে বুঝবেন ডিম টাটকা কি না? (একটি ছোট্ট টিপস)
বাজার থেকে ডিম আনার পর একটি গামলায় বেশ কিছুটা জল নিন এবং ডিমগুলো তার মধ্যে ছেড়ে দিন। যে ডিমগুলো একদম জলের তলায় শুয়ে থাকবে, বুঝবেন সেগুলো একেবারে টাটকা। যেগুলো একটু হেলে থাকবে, সেগুলো কয়েকদিনের পুরোনো। আর যে ডিমগুলো জলের ওপরে ভেসে উঠবে, সেগুলো ভুলেও বাচ্চাকে দেবেন না, কারণ সেগুলো ভেতরে নষ্ট হয়ে গেছে।
ডিম সংরক্ষণের কিছু জরুরি নিয়ম যা জানা দরকার
আমরা বাজার থেকে ডিম এনে অনেক সময় ধুয়ে পরিষ্কার করে ফ্রিজে রেখে দিই। এটা কিন্তু একেবারেই ঠিক কাজ নয়। ডিমের খোলার ওপর প্রাকৃতিকভাবে একটি অত্যন্ত পাতলা অদৃশ্য আবরণ থাকে, যা বাইরের ব্যাকটেরিয়াকে ডিমের ভেতর ঢুকতে বাধা দেয়। আপনি যখনই ডিম ধুয়ে ফেলেন, তখন ওই আবরণটি নষ্ট হয়ে যায় এবং ফ্রিজের অন্যান্য খাবারের ব্যাকটেরিয়া সহজেই ডিমের ভেতর ঢুকে যায়।
তাই ডিম বাজার থেকে এনে না ধুয়েই একটি নির্দিষ্ট বাক্সে ফ্রিজে রাখুন। যখন বাচ্চাকে রান্না করে দেবেন, ঠিক তার আগে ভালো করে কলের জলে ডিমটি ধুয়ে নিয়ে তারপর সেদ্ধ করতে বা ভাঙতে বসবেন। আর ফ্রিজ থেকে বের করা একদম ঠান্ডা ডিম সাথে সাথে ফুটন্ত জলে দেবেন না, এতে ডিম ফেটে যায়। কিছুক্ষণ বাইরে সাধারণ তাপমাত্রায় রেখে তারপর রান্না করবেন।
স্কুলের টিফিনে ডিম দেওয়ার সঠিক নিয়ম
মায়েরা অনেক সময় স্কুলের টিফিন বক্সে সেদ্ধ ডিম দিয়ে দেন। কিন্তু টিফিনের সময় বাচ্চা যখন বক্স খোলে, তখন ডিম থেকে একটা বাজে গন্ধ বেরোয় এবং বাচ্চার খেতে ইচ্ছা করে না। এর কারণ হলো সেদ্ধ ডিম বেশি সময় বদ্ধ জায়গায় থাকলে তার ভেতরকার সালফার থেকে গন্ধ তৈরি হয়।
টিফিনে ডিম দিতে হলে সেদ্ধ ডিমের বদলে সবজি দেওয়া অমলেট, ডিমের পরোটা বা ফ্রেঞ্চ টোস্ট বানিয়ে দিন। এগুলো ঠান্ডা হলেও খেতে ভালো লাগে এবং কোনো গন্ধ হয় না। যদি সেদ্ধ ডিম দিতেই হয়, তবে ডিমটা মাঝখান থেকে না কেটে একদম গোটা অবস্থায় টিফিন বক্সে দেবেন, এতে গন্ধ কম ছড়ায়।
পরিশেষে আপনাদের জন্য কিছু কথা
আপনারা যারা এতক্ষণ ধরে আমার এই লেখাটি পড়লেন, অভিভাবক হিসেবে আপনাদের সচেতনতা দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ। সন্তানকে বড় করা কোনো সহজ কাজ নয়, এটি প্রতিদিনের একটি নতুন পরীক্ষা। আপনার বাচ্চা যদি কোনোদিন ডিম বা অন্য কোনো পুষ্টিকর খাবার খেতে না চায়, তবে হতাশ হবেন না বা রেগে গিয়ে তার গায়ে হাত তুলবেন না। মনে রাখবেন, জোর করে খাওয়ানো খাবার বাচ্চার শরীরে ঠিকমতো পুষ্টি জোগাতে পারে না, কারণ তখন তার মনে আনন্দ থাকে না। একটু ধৈর্য ধরুন, রান্নার ধরন বদলান, বাচ্চার সাথে হাসিমুখে গল্প করতে করতে তাকে খাওয়ান। পরিবেশ সুন্দর থাকলে বাচ্চা নিজে থেকেই সব খাবার খেতে শুরু করবে।
ডিম দিয়ে তৈরি এই সহজ এবং পুষ্টিকর রেসিপিগুলো আজই আপনার সোনামণির ওপর প্রয়োগ করে দেখুন। আমি নিশ্চিত, যে বাচ্চা ডিম দেখলেই পালাতো, সে এখন নিজেই আপনার কাছে এসে ডিমের এই মজার পদগুলো খেতে চাইবে। আমাদের উদ্দেশ্যই হলো আপনাদের প্যারেন্টিং জার্নি বা সন্তান প্রতিপালনের এই সময়টাকে একটু সহজ এবং আনন্দময় করে তোলা।
আপনার মতামত আমাদের কাছে ভীষণ দামি!
আপনার বাচ্চা কি ডিম খেতে ভালোবাসে? আপনি তাকে কীভাবে ডিম রান্না করে দেন? আপনার নিজস্ব কোনো রেসিপি বা খাওয়ানোর বুদ্ধি থাকলে অবশ্যই আমাদের সবার সাথে শেয়ার করুন। আপনার একটি ছোট্ট অভিজ্ঞতা হয়তো অন্য একজন চিন্তিত মায়ের অনেক বড় উপকারে আসতে পারে।
আর হ্যাঁ, লেখাটি যদি আপনাদের একটুও উপকারে আসে, তবে আপনার পরিচিত অন্যান্য বাবা-মায়েদের সাথে এটি শেয়ার করতে ভুলবেন না। আরও নতুন নতুন প্যারেন্টিং টিপস, বাচ্চাদের স্বাস্থ্য এবং পড়াশোনা নিয়ে নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের 'Smart Shishu' ওয়েবসাইট ভিজিট করুন এবং আমাদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম পেজ ফলো করে আমাদের ছোট্ট পরিবারের অংশ হয়ে যান। সবাই খুব ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন এবং বাচ্চাদের খেয়াল রাখবেন। দেখা হচ্ছে আগামী পোস্টে!