সকালে ইস্কুল যাওয়ার সময় হলেই বাচ্চাদের কান্না শুরু হয়ে যায় কখনো পেটে ব্যাথা কখনো মাথায় ব্যথা ইত্যাদি ধরনের বাহানা তাই কিছু সহজ উপায়!
প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠার সাথে সাথে আপনার বাড়িতেও কি এক অদ্ভুত যুদ্ধ শুরু হয়? ঘড়িতে অ্যালার্ম বাজার পর থেকেই বাচ্চার অকারণ কান্নাকাটি, বিছানা না ছাড়ার জেদ, আর একটাই কথা— "আমি আজ কিছুতেই স্কুলে যাব না!" কখনো হঠাৎ করে পেট ব্যথা শুরু হয়ে যায়, কখনো মাথা ব্যথা, আবার কখনো বাচ্চার চোখে দেখা যায় এক অদ্ভুত আতঙ্ক। বর্তমান সময়ের প্রায় প্রতিটি ঘরেই বাবা-মায়েদের একটি অত্যন্ত বড় এবং চিন্তার বিষয় হলো সন্তানদের এই 'স্কুল-ভীতি'।
একজন অভিভাবক হিসেবে আপনি হয়তো অনেক সময় বিরক্ত হয়ে যান, অফিসের (কাজ) দেরি হওয়ার চিন্তায় নইলে বাড়িতে রান্না করার বা অন্যান্য কাজের চিন্তা। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন তো, যে শিশুটি ছুটির দিনে সারাদিন বাড়িতে হাসিখুশি থাকে, সে কেন হঠাৎ করে স্কুলের নাম শুনলেই এমন বদলে যায়? আজকের এই বিশেষ ইস্কুল না যাওয়ার জন্য আমরা এই সমস্যার একেবারে গভীরে প্রবেশ করব। কোনো তাত্ত্বিক কথা নয়, বরং বাস্তবসম্মত ও পরীক্ষিত কিছু কৌশল নিয়ে আজ আলোচনা করব, যা প্রয়োগ করলে আপনার সন্তান নিজে থেকেই আনন্দের সাথে স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হবে।
বাচ্চাদের স্কুল না যাওয়ার পেছনের আসল কারণ কী? সমস্যা চিনতে শিখুন
বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর উপায় খোঁজার আগে, আমাদের একজন গোয়েন্দার মতো খুঁজে বের করতে হবে যে তারা আসলে কেন স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে কেন তারা ইস্কুল যেতে চায় না এটি আগে জানা দরকার। আমরা বাবা-মায়েরা অনেক সময় ভাবি বাচ্চা ইচ্ছা করে বা নিছক অলসতার কারণে এমন করছে, কিন্তু শিশু মনস্তত্ত্ব বলছে অন্য কথা। প্রতিটি কান্নার পেছনেই একটি অব্যক্ত কারণ লুকিয়ে থাকে। আসুন জেনে নিই সেই কারণগুলো কী কী:
১. ইস্কুলটা হয়তো দূরে তাই মা-বাবাদের কাছে থেকে দূরে যাওয়ার ভয়
বিশেষ করে যেসব বাচ্চারা সবেমাত্র নার্সারি বা প্রাইমারি স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে, তাদের মনে সব সময় একটি ভয় কাজ করে যে, "আমি স্কুলে গেলে বাবা-মা যদি আর আমাকে নিতে না আসে!" দীর্ঘক্ষণ বাবা-মায়ের নিরাপদ আশ্রয় থেকে দূরে থাকাটা তাদের জন্য একটি বিশাল নিরাপত্তাহীনতার জায়গা তৈরি করে। বাচ্চা যখন বলবে সে স্কুলে যাবে না, তখন সরাসরি "কেন যাবে না?" না জিজ্ঞেস করে তাকে কাছে টেনে বলুন ভালোবেসে এবং আসতে আসতে বলুন, "স্কুলে তোমার কোন জিনিসটা সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে আমাকে চুপিচুপি বলো তো?" বা বলতে পারেন তোমাকে কি স্কুলের শিক্ষক বা শিক্ষিকা বকে? নইলে জিজ্ঞাসা করতে পারেন তোমাকে কি স্কুলে কাউকে ভয় লাগে যেমন কোন স্যার এমন ভাবে জিজ্ঞাসা করলে বাচ্চারা একটু শান্তিবোধ করবে।
২. গ্যাজেটের দুনিয়া শিশুদের জন্য খুব ক্ষতিকর
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ক্ষতিকর কারণটি হলো অতিরিক্ত মোবাইল বা টিভির দেখা। বাড়িতে বাচ্চা যখন মোবাইল বা টিভিতে কার্টুন দেখে, তখন তার মস্তিষ্কে তীব্র আনন্দের উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। কিন্তু স্কুলের পরিবেশ নিয়মকানুন ও শৃঙ্খলায় বাঁধা। সেখানে কার্টুনের মতো চটকদার কিছু নেই। তাই গ্যাজেটে আসক্ত বাচ্চাদের কাছে স্কুল অত্যন্ত 'বোরিং' বা একঘেয়ে মনে হয় এবং তারা সেখানে যেতে চায় না।
৩. স্কুলের ভেতরের কোনো নেতিবাচক অভিজ্ঞতা
হয়তো অন্য কোনো বন্ধু তাকে বকা দিয়েছে, তার টিফিন কেড়ে নিয়েছে, কিংবা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছে। অনেক সময় ক্লাসের পড়া বুঝতে না পারলেও বাচ্চারা স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। স্কুল থেকে ফেরার পর বাচ্চাকে সাধারণ প্রশ্নের বদলে জিজ্ঞেস করুন, "আজ ক্লাসে সবচেয়ে মজার কী হলো?" বা "আজ কে কে তোমার সাথে খেলল?" বা একটি প্রশ্নের মধ্যে করতে পারেন যেমন "আজকে তোমার সাথে ইস্কুলে কি কি হয়েছে?" এই ধরনের কথার মাধ্যমে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন স্কুলে তাকে কেউ বিরক্ত করছে কি না। আমি প্রত্যেক মাতা পিতাদের বলবো তাদের বাচ্চাদের সাথে এই প্রশ্ন করা দরকার।
"আমার পেট ব্যথা করছে!" - সত্যি নাকি মিথ্যা স্কুল না যাওয়ার বাহানা?
অনেক সময় বাচ্চারা সকালে ইস্কুল যাওয়ার সময় শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে। অভিভাবক হিসেবে আমাদের বুঝতে হবে যে এই ব্যথাটা অনেক সময় মিথ্যে না হতেও পারে, বরং মানসিক চাপ (Anxiety) থেকেই শারীরিক অস্বস্তির সৃষ্টি হয়। মনোবিদরা বলছেন, যদি দেখেন ছুটির দিনগুলোতে বাচ্চার কোনো ব্যথা নেই, কিন্তু সোমবার সকালে উঠলেই সে ব্যথার কথা বলছে, তবে বুঝতে হবে এটি মানসিক চাপজনিত (Psychosomatic) ব্যথা।
বাচ্চার এই অসুস্থতাকে সরাসরি মিথ্যে ভেবে তাকে বকবেন না। তার অনুভূতিকে সম্মান জানিয়ে বলুন, "আমি জানি তোমার পেটে একটু অস্বস্তি হচ্ছে, কারণ আজ স্কুলে যেতে তোমার একটু ভয় লাগছে। কিন্তু আমি জানি তুমি খুব সাহসী, তুমি স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের সাথে দেখা করলেই এই ব্যথাটা ম্যাজিকের মতো সেরে যাবে।" যদি মনে হয় বাচ্চা বাহানা করছে, তবে তাকে বাড়িতে থাকতে দিন, কিন্তু সেই দিনটিকে অত্যন্ত 'বোরিং' করে তুলুন নইলে প্রত্যেকদিন এই বাহানায় করবে। তাকে জানিয়ে দিন যে, যেহেতু সে অসুস্থ, তাই আজ কোনো মোবাইল বা টিভি দেখা যাবে না। দেখবেন, পরের দিন থেকে তার আর কোনো "অসুস্থতা" থাকছে না!
সকালের যুদ্ধ থামানোর স্মার্ট ও শান্ত রুটিন
সকালের সময়টা প্রতিটি বাড়িতেই ভীষণ ব্যস্ততার। এই তাড়াহুড়োর মধ্যেই যখন বাচ্চা জেদ ধরে, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এই রুটিনটিকে একটু স্মার্টভাবে সাজাতে হবে:
- আগের রাতের প্রস্তুতি: সকালের তাড়াহুড়ো এড়াতে আগের দিন রাতেই বাচ্চার স্কুল ব্যাগ, জলের বোতল, জুতো এবং ইউনিফর্ম গুছিয়ে রাখুন। বাচ্চাকেও এই কাজে যুক্ত করুন, তাকে জিজ্ঞেস করুন, "কাল তুমি টিফিনে আপেল খাবে নাকি লুচি?" এই ছোট ছোট স্বাধীনতাগুলো তাকে স্কুলের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে।
- ঘুম থেকে তোলার সঠিক উপায় হঠাৎ করে জোরে ডেকে তুললে বা অ্যালার্মের কর্কশ শব্দে বাচ্চার মনে বিরক্তি তৈরি হয়। বাচ্চার নির্দিষ্ট ওঠার সময়ের অন্তত ১৫ মিনিট আগে তাকে জাগানোর প্রক্রিয়া শুরু করুন। ঘরের পর্দা সরিয়ে ভোরের আলো আসতে দিন, তার মাথায় হাত বুলিয়ে কোনো সুন্দর ছড়া বা গান গেয়ে তাকে তুলুন *একবারে ডেকে তোলার ভুল করবেন না তাতে বাচ্চা বেশি বিরক্তি হবে।।
- আনন্দের জন্য চুমু সকালে বাচ্চার হাতের তালুতে একটি চুমু খেয়ে হাতটা মুড়িয়ে দিন এবং বলুন, "যখনই তোমার আমার কথা মনে পড়বে, এই জাদুর চুমুটা গালে লাগিয়ে নেবে, দেখবে আমি তোমার পাশেই আছি।" এই মনস্তাত্ত্বিক কৌশলটি বাচ্চার আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অভিভাবক হিসেবে কী করবেন এবং কী একেবারেই করবেন না?
বাচ্চাদের এই সংবেদনশীল সমস্যাটি সমাধানের জন্য আমাদের নিজেদের আচরণেও কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। নিচে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা দেওয়া হলো:
কী করবেন:
- বাচ্চার কান্না দেখে নিজে রেগে যাবেন না। আপনার শান্ত থাকাটা বাচ্চাকে আত্মবিশ্বাস দেবে। বাচ্চার কান্নার সময় তার চোখের লেভেলে বসে কথা বলুন।
- স্কুলের শিক্ষিকাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন এবং বাচ্চার সামনে স্কুল বা শিক্ষকদের নিয়ে সবসময় ইতিবাচক কথা বলুন।
- বাড়ি ফিরে বাচ্চাকে অন্তত এক ঘণ্টা পড়াশোনা নিয়ে কোনো কথা বলবেন না, তাকে রিল্যাক্স করতে দিন।
কী একেবারেই করবেন না:
- "স্কুলে না গেলে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে" বা "স্যারকে বলে দেব তোকে বকতে"—এই ধরনের মিথ্যা ভয় কখনোই দেখাবেন না।
- "দেখো, পাশের বাড়ির রাহুল কত সুন্দর স্কুলে যায়, আর তুমি সারাদিন শুধু কাঁদো!"—এই ধরনের তুলনা বাচ্চার আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। *কখনো অন্য বাচ্চাদের সাথে তুলনা করবেন না।
- "আজ স্কুলে গেলে তোমাকে বড় চকলেট কিনে দেব"—এই ধরনের কথা বলে স্কুলে পাঠানোর অভ্যাস করবেন না। প্রথম প্রথম অসুবিধা না হলেও ভবিষ্যতে ক্ষতি।
শেষ কথা শাসন নয়, হোক ভালোবাসার জয়
মনে রাখবেন, আজ যে ছোট্ট হাতটা আপনার হাত শক্ত করে ধরে স্কুল গেটে দাঁড়িয়ে কাঁদছে, আপনার একটু বিশ্বাস আর ভালোবাসার জোরে সেই হাতটাই একদিন অনেক বড় বড় সাফল্য ছিনিয়ে আনবে। আসুন, আমরা সবাই মিলে আমাদের শিশুদের জন্য এমন একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলি, যেখানে তারা গ্যাজেটের ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তব জীবনের শিক্ষাকে আনন্দের সাথে গ্রহণ করতে শেখে।
আমার এই লেখাগুলো পড়ে যদি আপনার একটুও ভালো লেগে থাকে এবং মনে হয় যে কথাগুলো যুক্তিসঙ্গত, তবে আপনার পরিচিত অন্যান্য চিন্তিত বাবা-মায়েদের সাথে এটি শেয়ার করতে ভুলবেন না। আপনার সন্তান কীভাবে স্কুলে যায় বা তার জেদ আপনি কীভাবে সামলান, সেই মূল্যবান অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারেন, Instagram , Facebook বা Email করে ধন্যবাদ।